Home / Bengali Food Culture / শীতের সোয়াদ (Shiter Swad): নবান্ন, পিঠে পার্বণ ও বাঙালির শীতের স্মৃতি

শীতের সোয়াদ (Shiter Swad): নবান্ন, পিঠে পার্বণ ও বাঙালির শীতের স্মৃতি

শীতের নবান্ন, ইতুপুজো ও পৌষ সংক্রান্তির পিঠে পার্বণ: ফেলে আসা দিনের স্বাদ ও স্মৃতি

শীত কক্ষনও দোলায় চেপে, ঘোড়ায় চেপে, নৌকায় চেপে আসেন না যে চার দিকে মড়কের হাহাকার পড়ে যাবে। ধরণী শস্যশ্যামলা। চার দিকে প্রাচুর্যের হিল্লোল। কবে কোন কালে সব জমিজমা বিক্রি করে শহরে বসত, তবু শহুরিয়ারা তাদের শিকড়ের স্বাদ-গন্ধ ভুলতে পারে না। তাই শহর বাজারেও নতুন ফসলের উৎসব হয় ঘরে ঘরে। নবান্ন। নতুন চালবাটা, আখঝাড়াই, মটরশুঁটি, মুলো, কমলালেবু। আর যা যা ফল পাওয়া যায়, অন্তত ন-রকম। সব নলেন গুড়ে আর কাঁচা দুধে মেখে নবান্ন। পুরো জিনিসটাই আসলে প্রসাদ। প্রকৃতির প্রসাদ। এক অভিনব ফ্রুট স্যালাডও বটে, নৈবেদ্যও বটে। তবে, নৈবেদ্যটি আমাদেরই ‘পেট্টায়’ হয়ে থাকে।

নবান্নের সময় শীতের বাজারে নতুন সবজি ও ফলের সমারোহ।

১. নবান্নের সময় শীতের বাজারে নতুন সবজি ও ফলের সমারোহ

নবান্নের গন্ধমাখা সেই অঘ্রান গড়াতে থাকে আর বাজার থেকে আসতে থাকে আধোফোটা, কী আঁটসাট ফুলকপি, সবুজে-সাদায় টাইট বাঁধাকপি, ম্যাজেন্টার আভা লাগা সাদা সাদা মুলো, হালকা সবুজ ওলকপি, সাদা সাদা ফুলতোলা গোছা গোছা পেঁয়াজকলি, ভেতরে টকটকে লাল বাইরে ধূলিবর্ণ বিট, কমলা রঙের নিটোল গাজর, চ্যাপ্টা সবুজ ফ্রেঞ্চ বিন, কালচে সবুজ চওড়া চওড়া শিম। কত বলব? চওড়া পাতার পালং শাক, সাদা ধবধবে দুধমান (কচু), মটরশুঁটি, টুকটুকে টোম্যাটো। আর, সবার ওপরে সত্য যা, শীতের শ্রেষ্ঠ দান — ননীতাল আলু। ননীর তালের মতোই। আমরা সারা শীত ভরে আলুভাতে, আলুভাজা খেতে ভালবাসতুম।

পটল বেচারিরা পেকে হলদে কটকটে হয়ে বিদায় নিচ্ছে। ঢেঁড়স ছেতরে গেছে, কেউ আর তাদের পুঁছছে না। তেমনই দশা ঝিঙে আর লাউয়ের৷ চালকুমড়ো, পেঁপে, লাল কুমড়োর বারোমেসে৷ তবু এখন তাদের মোটেই কদর নেই। বেগুন সুন্দরীরা সুযোগ বুঝে হাল ফিরিয়ে ফেলেছে। কে বলবে ক’দিন আগেই রোগা, দরকচা, বিচিওলা, কুটকুটে ছিল! এখন তারা মুক্তকেশী, সবুজে-বেগুনিতে মেশামেশি। কিংবা ঘোর বেগুনি, বেশ নধর গিন্নিবান্নি টাইপের। এই বেগুনভাজা মোলায়েম মাখনের মতো একেবারে। আর, কাঁচা লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে এই বেগুন পুড়িয়ে খেলেও মুখ ছেড়ে যাবে।

২. অঘ্রানের রবিবারে ইতুপুজো ও পালুনির ভাতেভাত

এই নতুন শস্যের শুভাগমন কার জন্য? সূর্যের জন্যই তো প্রধানত। সে ভদ্রলোক তাঁর ভোল্টেজ নরম-গরম না করলে তো কিছুই হত না! তাই জনগণ, গ্রামে গ্রামে যাঁরা প্রকৃতির কাছাকাছি বাস করে প্রকৃতির দানের মর্ম বুঝতে পারেন, তাঁরা ইতুপুজো চালু করেছিলেন অঘ্রানের দিনে। পয়লা অঘ্রান ইতুর ঘট পাতা হবে। একটা বড় সরায় মাটি বিছিয়ে তাতে ধান, কলাই, ছোলা ইত্যাদির বীজ পোঁতো। তাতে প্রতি দিন একটু একটু করে জল দিতে হবে, ছোট্ট ছোট্ট ইতুর ঘট পাওয়া যায়৷ ক’দিন পরেই, ছোট্ট ছোট্ট কল উঠবে, বাড়তে থাকবে চারা। এই সরা-ঘট ঠাকুরঘরে রাখা থাকবে। অঘ্রানের শেষ দিনে অর্থাৎ সংক্রান্তিতে গঙ্গায় বিসর্জন হবে। ইতিমধ্যে প্রতি রবিবার ইতুর পালুনি।

অঘ্রান মাসে ইতু পুজোর অঙ্কুরিত বীজের সরা ও গ্রামীণ আচার।

ভোর ছটা বেজেছে কী বাজেনি। বাসিমুখে বাসি কাপড়ে ইতুর পাঁচালি বলবেন মা, লেপের ভেতর থেকে উঁকি মেরে শুনব আমরা। উমনো-ঝুমনোর গপ্পো। ইতুর পালুনি কিন্তু খুব সোজা। রবিবারে রবিবারে নিরামিষ ভাতেভাত খেতে হবে। নতুন চালের চমৎকার সুগন্ধি ভাত, তাতে গাওয়া ঘি পড়বে৷ আর, আলু, কপি কড়াইশুঁটি ভাতে, কাঁচকলা ভাতে, মুলোভাতে, এবং মটরডাল ভাতে। মটরডাল এক রাত ভিজিয়ে রেখে বেশ আঁট-আঁট করে বেটে নিতে হবে। উনুনে জল চড়িয়ে দিন। জলটা যখন টগবগ করে ফুটবে, তখন মটরডালবাটা গোল্লা গোল্লা করে তার মধ্যে ছেড়ে দিন। একটু ফুটলেই সেগুলো শক্ত হয়ে যাবে। তার পর সেই মটরডালের টেনিস-বলগুলি ভেঙে তাতে কাঁচা সরষের তেল, নুন, কাঁচা লঙ্কা মেখে আবার গোল্লা পাকান। গরম ভাতে গাওয়া ঘি। তাই দিয়ে আর সব ভাতের সঙ্গে মটরডাল ভাতে। অমৃতের সঙ্গে তফাত নেই।

৩. শীতকালের আটপৌরে খাওয়া-দাওয়া ও হেঁশেলের মচ্ছব

অঘ্রানের বা বলতে গেলে পুরো শীতকালের আটপৌরে খাওয়াদাওয়াই আমাদের মচ্ছব ছিল। প্রতিটি দিন সকাল থেকে সন্ধে সুগন্ধে ভরপুর হয়ে রয়েছে চার দিক। সাধারণত রান্নার গন্ধ ভাল লাগে না। তাতে খিদে মরে যায়। কিন্তু, শীতের এই সব সবজির রান্নার গন্ধ এমনই পবিত্র যেন কোথাও দেবতার ভোগ রান্না হচ্ছে। ফুলকপিকে আলু-শিম দিয়ে চচ্চড়ি করুন, আলু বেগুন বড় বড় লম্বা লম্বা করে কেটে বড়ি বিন দিয়ে রুই-কাতলার ঝোল করুন জিরে ধনে আদা মরিচ দিয়ে। কিংবা ডুমো ডুমো আলু মটরশুঁটি ভাল করে কষে গরম মশলার নিরামিষ বা ভেটকি মাছ দিয়ে কালিয়া, শুকনো শুকনো ঘণ্টও করা যায়। পিঁয়াজকলির চচ্চড়িতে কুচো চিংড়ি তো অবশ্যই পড়বে। বাঁধাকপিরও ঘণ্ট করুন, বড়ি ভেজে গুঁড়িয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে ওপরে। একটু চেপে চেপে দিতে হবে। পালং শাকের ঘণ্ট বা মুলোঘণ্টতেও তাই। সঞ্জীব কপূরের মতো করে বলি, বড়ি ভেজে গুঁড়িয়ে ওপর থেকে ছড়িয়ে, তিন-চারটি কাঁচা লঙ্কা পুঁতে টেবিলে দিন। শোভা হবে। সবেতেই মটরশুঁটিরা জেগে থাকবে। প্রতি গ্রাসে মটরশুঁটি। তবে না মজা! পালং শাকের বড় বড় পাতা আর একটু মটরশুঁটি কড়াতে হালকা আঁচে চাপিয়ে দিন। সামান্য নুন, পাঁচ মিনিটেই রেডি। কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা তেল দিয়ে একটু একটু সবজে ঝোল সমেত সেই শাক, যেমন উপাদেয়, তেমনই স্বাস্থ্যকর।

নবান্ন উৎসবের ঐতিহ্যবাহী অন্নভোগ ও গ্রামীণ রন্ধন আয়োজন।

শীতের স্পেশাল মাছ বলতে গলদা চিংড়ি, আর ভেড়ির ভেটকি। তার যে কত রকম পদ হয়, সে আমার চেয়ে আমবাঙালি রাঁধিয়ে খাইয়েরা বেশি জানেন। তবে, শীতকালে পার্সে, ট্যাংরা, কই, মাগুর ইত্যাদি মাছেরও মরশুম। সন্ধে পার হতেই বেগুন সেঁকা বা পোড়ার গন্ধ, ফুলকপি কষার গন্ধ ছড়িয়ে যাবে চার দিকে। রান্না হয়ে গেলেই খেয়ে নেওয়ার নিয়ম| গরম গরম৷ কার পড়া শেষ হয়নি, কার আড্ডা দিয়ে ফিরতে দেরি হবে, হেঁশেল সে সব শুনবে না। যেখানেই যাও, যা-ই করো, সাড়ে আটটার মধ্যে ফিরে, এসো বোসো আহারে—হেঁশেলের ছুটি করে দাও।

৪. ভোরের কুয়াশায় জয়নগরের মোয়া, ছোলার শাক ও চিবোনো আঁখ

শীতের সকালগুলো ঝাপসা। লেপ ছাড়তে ইচ্ছে করে না। সেই ভোরবেলায় ঘুমভাঙা গলায় ফিরিওলা ডেকে উঠবে, ‘ছোলার চাক, মুড়ির চাক, চিঁড়ের চা–ক'। লেপ ছেড়ে লাফিয়ে উঠলুম ছোটরা। দৌড়ে গিয়ে চাকওলাকে ক্যাঁক করে ধরতে হবে। যার যে চাক পছন্দ, সে সেটা স্বহস্তে খরিদ করবে চাকটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি, যাকে মোয়া বলে জানি সে শীতকালের ভোর-সকালে কেন চাক হয়ে যায়, ভেবে কূল পাই না। তবে, মোয়ার জন্যেও চিন্তা নেই। একটু পরেই, রোদ উঠলেই হাঁক উঠবে— এএএজয়গরের মোঁওযা। সবটাই আনুনাসিক। মোয়াওলা বিশেষ সম্ভ্রান্ত। তার বড় ঝুড়িতে মোয়ার হাঁড়ি ছাড়াও আছে কলসিতে কলসিতে নলেন গুড় এবং শালপাতার আড়ালে পাটালি । কিন্তু, গুণী লোক তো তাঁর সব গুণের কথা হেঁকে হেঁকে বলতে যান না! তাঁর এহেন ঝুড়িটি নামিয়ে দিতে কাউকে চাই৷ তুলতেও তাই। মোয়ার সৌজন্যে এই জয়নগরীরা প্রভূত বিদ্বান গুণী-জ্ঞানীদের নাম জানে। পরে এক মোয়াওলার দেখা পেয়েছিলুম, যার মোয়া কিনতে অস্বীকার করলে সে ইউনিভার্সিটির অমলেন্দুবাবুর দিব্যি গালে। এ সব মোয়া নাকি তাঁরই অর্ডারি। বিন্নি ধানের খই আর উৎকৃষ্ট এক নম্বরের নলেন গুড় না হলে হয়ই না। তার সঙ্গে কিসমিস, বাদাম, পেস্তা গজগজ করছে। সেই অর্ডারি মোয়া কয়েকখানা পড়ে আছে। তা-ও কি নেব না? স্যুট-পরিহিত অমলেন্দুস্যারকে এক হাতে এডমাণ্ড চসার, অন্য হাতে জয়নগরের মোয়া কল্পনা করে বিশেষ আনন্দ পাই। মোয়াগুলি কিনেই ফেলি। কিন্তু, এক কামড় দিয়েই বুঝে ফেলি, আর যা-ই হোক, এ মোয়া সে মোয়া কখনই নয়। যাই হোক, তখন আমাদের পুরো এক কলসি নলেন গুড়, অন্তত খান দুই তিন পাটালি, আধ হাঁড়ি মোয়া গছিয়ে দিয়ে হালকা হয়ে মোয়াওলা চলে যেত— এএএজয়নগরের মোয়া...।

একদম শীতের গোড়ায়, নিঝুম দুপুরে তখন আর একটা ডাক উঠত, ‘ছোলার শাক, ছোলার শাক’ কিংবা ‘ছোলা ঘাস, ছোলা ঘাস, ছোট ছোট। বেশির ভাগ দিনই তাকে ধরতে পারতুম না। তার যেন বিক্রির কোনও গরজই নেই! শাঁ শাঁ করে হেঁটে চলে যাবে। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার ধরনধারণ| ব্যাপারটা হল সবুজ গাছসুদ্ধ কাঁচা ছোলা। গাছকে শাক বলাটা ছোটবেলার কানে অবাক লাগত। তার চেয়েও অবাক ‘ঘাস’ ‘ছোলাঘাস’ কী রে বাবা! যাই হোক, জলজ্যান্ত গাছ থেকে কাঁচা সবুজ ছোলা খুঁটে খুঁটে খাওয়ার মজাই আলাদা। কিছু এমন মহামহোপাধ্যায় খাদ্য নয় যে, আজকালকার শহুরে ছেলেমেয়েরা পেল না বলে মন খারাপ করতে হবে| আসল হল খাদ্যটা নয়, খাওয়ার মজা। আখের কথাটাই ধরুন ৷ খোলা দাঁত দিয়ে উপড়ে চিবিয়ে আখের রস খাওয়ারই কি কম মজা!

৫. ছাদে রোদ আর শাঁখের আওয়াজে মায়ের বড়িহাত ও বুড়োবুড়ি

অঘ্রানের এক শুভ দিনে বড়িহাত করতেন মা। আমরা দারুণ উত্তেজিত, উৎসাহিত। রাত্তিরবেলা বিউলির ডাল ভিজবে। সকালে ননীবালা সেই ডাল বাটবে। এই উপলক্ষে ননীর একটি কাপড় (পুরনো) ব্লাউজ ও পেটিকোট লাভ হবে। কেননা, কাচা জামা-কাপড় পরে না বাটলে বড়ি খারাপ হয়ে যাবে। বাটা ডাল কাঁসার ঝকঝকে গামলায় ফেটাবেন মা ফটাফট করে। হিং, একটু খাওয়ার সোডা, ব্যস। ফেটিয়ে ফেটিয়ে ডালটা ফুলে ডবল। এ বার গামলা, নতুন কুলো, নতুন কাপড়ের টুকরো, তেল-মাখানো থালা, সব নিয়ে ছাদে উঠবেন মা৷ ধান-দুব্বো-সিঁদুর রেকাবিতে নিয়ে। শাঁখ হাতে আমরা পেছন পেছন৷ আগের দিন ছাদ ঝেটিয়ে ধুয়ে দুরস্ত করে রাখা হয়েছে। রোদ লুটোপুটি খাচ্ছে। কোণে কোণে ছোটরা নিযুক্ত পাখি তাড়াতে। কুলোর ওপর কাপড় বিছিয়ে পাঁচ আঙুলের কায়দায় টুম্বুস করে পর পর দুটি ডালের দলা পড়বে, তার ওপর দিকটা ছুঁচলো করে দিলেন মা৷ তাদের ওই উঁচু নাকে ধান-দুব্বো, একটির ওপর সামান্য সিঁদুরও পড়ল। এঁরা হলেন বুড়োবুড়ি। বিশেষ অতিথি। এর পর টপাটপ বড়ি পড়বে কুলোর কাপড়ে, থালায়। আর তাদের নাক টেনে টেনে লম্বা করা হবে। ক্রমে ক্রমে হবে পেঁপে বড়ি, কুমড়ো বড়ি, মুলো বড়ি, কপি বড়ি। মানে, সামান্য পেঁপে বা ছাঁচি কুমড়ো, মুলো বা কপি কুরে বড়ির ডালে মিশিয়ে দেওয়া হবে। অপূর্ব স্বাদ এদের। আজকাল আর পাওয়া যায় না। এ ছাড়াও আছে মুসুরের গোলাপি বড়ি, পোস্ত বড়ি, তিল বড়ি, গয়না বড়ি। গয়না বড়ি আবার দেওয়া নেওয়া হবে।

৬. শীতের রোদঝলমলে আকাশে পায়রার ওড়াওড়ি আর চিলের হানা

সারা শীত জুড়ে সকালবেলার ঝকঝকে রোদ্দুরে মালিকদের শিসের সঙ্গে পায়রার দল উড়বে৷ ফাইটার প্লেনের মতো তাদের নানা রকম ফর্মেশন৷ এ দিক থেকে এক দল উড়ল তো, ও দিক থেকে আর এক দল| অনেক উঁচুতে চিল। হঠাৎ ঝুপ করে নেমে আসবে। এই যাঃ! দলছুট শেষ পায়রাটাকে নখে বিঁধিয়ে নিয়ে পাশের বাড়ির চিলেকুঠরির ছাতে নামছে। রোমশ গোদা পা, যেন মোজা পরে আছে। চোখে কী ক্রুর দৃষ্টি! ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। ছিঃ! আমরা আর সিনে নেই। সব প্লি প্লা। মানে, পালিয়ে গেছি।

৭. পৌষপ্রখর শীত, বাউনি বাঁধা ও মকর সংক্রান্তির পিঠে পার্বণ

‘পউষপ্রখর শীতে জর্জর ঝিল্লিমুখর রাতি’। সেই পউষের প্রধান পরব হল কিন্তু পরীক্ষা। তার পর বড় দিন। আর, তার পর মকর সংক্রান্তির পিঠে পার্বণ। এক একটা পরীক্ষা শেষ। আর সেই বিষয়ের বইগুলো থাবা করে এক পাশে সরিয়ে রাখি। তাই নিশ্চিন্তে যিশুর জন্মদিন চলে আসে। তার সঙ্গে পার্ক স্ট্রিটে আলোর বাহার। সেন্ট পল্‌‌সের বিরাট বেথলেহেম স্টার। ক্রিসমাস ট্রি, সান্তা ক্লজ এবং কেক পেষ্ট্রি। পঁচিশে ডিসেম্বর থেকে পয়লা জানুয়ারি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন প্রোগ্রাম। তার পরেই কনকনে তুষার-শীতল উত্তরে হাওয়াটি শনশনিয়ে এসে পড়বে। মকর সংক্রান্তি। সারা ভারত থেকে মানুষেরা ঝেটিয়ে যাচ্ছে গঙ্গাসাগর, আর আমাদের গৃহে গৃহে বাউনি বাঁধা হচ্ছে। বাউনি অর্থাৎ বামনি অর্থাৎ লক্ষ্মীঠাকরুন। যিনি নাকি বড়ই চঞ্চলা। তাই বেঁধে রাখতে হয়। রান্নাঘর, ভাঁড়ারঘর ঝাড়া পোঁছা হবে। নতুন হাঁড়িতে নতুন চাল, ওপরে হলুদ, রুপোর টাকা ধান রেখে সরা চাপা দিয়ে দেওয়া হল। এ বার পাকা ধানের শিষ বিনুনি করে দড়ি হল। সেই দড়ির বাঁধন পড়ল হাঁড়ির গলায়। আরও দড়ি দরজার আংটায় লাগানো হল। প্রথম পিঠে করে তাও হাঁড়িতে রেখে বাউনি বাঁধা হল| সংক্রান্তি কেটে গেলে গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হবে। ইতিমধ্যে বাড়িতে বাড়িতে বাউনি বাঁধার, শঙ্খধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেছে পিঠেপর্ব। নারকোল-খেজুর গুড়ের ছাঁই তৈরি হবে৷ তার পুর দিয়ে হবে সেদ্ধ পুলি। বৈশাখী শিবের মতন তার গড়ন। হবে মুগের ডালের মুগসামলি। সরু চাকলির ভেতর ক্ষীরের পুর দিয়ে পাটিসাপটা। রাঙালুর পিঠে, রসবড়া, মালপো, খাজা। কড়াইশুঁটির পুর দিয়ে আলুর নোনতা পিঠে, মটরশুঁটির কচুরি। সেদ্ধ পুলি নলেন গুড় দিয়ে খেতে হয়| সরু চাকলিও তাই। এক বার আমাদের এক রাঁধুনি মাসি আটার সঙ্গে খেজুর গুড় মিশিয়ে একটা গোলা তৈরি করে স্রেফ গোল গোল করে ভেজে আমাদের অবাক করে দিয়েছিল। দারুণ খেতে। নাম গুড় পিঠে। এর সঙ্গে অবশ্যই হত নতুন গুড়ের পায়েস।

পৌষ সংক্রান্তি ও পিঠে পার্বণের ঐতিহ্য — ‘পউষপ্রখর শীতে জর্জর ঝিল্লিমুখর রাতি’।

৮. জেনে রাখুন – পৌষ সংক্রান্তির কিছু কথা (প্রশ্ন ও উত্তর)

পৌষ সংক্রান্তি পশ্চিমবঙ্গে কীভাবে উদযাপিত হয়?
পৌষ সংক্রান্তি পশ্চিমবঙ্গে মূলত পিঠে-পুলি, পাটিসাপটা, নলেন গুড়ের মিষ্টি ইত্যাদি তৈরি করে উদযাপন করা হয়। এই সময় গ্রামবাংলায় মেলা বসে এবং নতুন ধানের ফসল ঘিরে আনন্দের আবহ তৈরি হয়।
Poush Sankranti in West Bengal is celebrated with traditional pithe, puli, and sweets made from nolen gur.

পশ্চিমবঙ্গের শীতের প্রধান উৎসব কোনটি?
পশ্চিমবঙ্গের শীতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো পৌষ সংক্রান্তি। এটি মূলত ফসল তোলার উৎসব এবং এই সময়ে শীতকালীন বিশেষ খাবার ও লোকসংস্কৃতির মিলন ঘটে।
It is the most important winter harvest festival in Bengal, known for seasonal foods and cultural traditions.

পৌষ সংক্রান্তির জন্য কোন রাজ্য সবচেয়ে পরিচিত?
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংক্রান্তি পালিত হলেও পশ্চিমবঙ্গ পিঠে-পুলি, নলেন গুড় এবং গ্রামীণ মেলার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
West Bengal is especially famous for its unique pithe-puli traditions and rural fairs during this festival.

পশ্চিমবঙ্গে সংক্রান্তি উৎসবকে কী বলা হয়?
পশ্চিমবঙ্গে সংক্রান্তি উৎসবকে সাধারণত ‘পৌষ সংক্রান্তি’ বলা হয়, যা বাংলা মাস পৌষের শেষ দিনকে নির্দেশ করে।
In Bengal, Sankranti is known as Poush Sankranti, marking the end of the Bengali month of Poush.

More in Bengali Food Culture