This article explores the traditional Bengali folk festival of Viswakarma Puja and Arandhan (no-cooking ritual) observed during Bhadra Sankranti. It highlights rural food traditions, ritual cooking practices, and cultural significance across different regions of Bengal.
Focus: Bengali festival food, Viswakarma Puja, Arandhan tradition, rural food culture
বিশ্বকর্মা পূজা ও অরন্ধন উৎসব – Viswakarma Puja & Arandhan Festival in Bengal
রান্না পুজোর ভোগ অঞ্চলভেদে আলাদা হয়? – Food Offerings in Ranna Puja Across Regions
অর্থাৎ কোথাও আমিষ ভোগ দেওয়া হয় তো কোথাও নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। আমিষ ভোগের ক্ষেত্রে ইলিশ এবং চিংড়ি মাছের রান্নার পদ দেওয়া অন্যতম। নিরামিষ ভোগের ক্ষেত্রে রকমারি ভাজা, ছোলা-নারকেল দিয়ে কচু শাকসহ একাধিক শাক, পান্তা ভাত, খেসারির ডাল, চালতা ও গুড় দিয়ে চাটনি, বড়া, মালপোয়া ইত্যাদি দেওয়া হয়।
রাঢ়ের সংস্কৃতিতে আন্নাপূজা, রান্নাপূজা ও অরন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকাচার অনুষ্ঠান। ভাদ্র সংক্রান্তিতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ভাদ্রসংক্রান্তির বিশ্বকর্মা পুজা ও অরন্ধন থেকে চৈত্রসংক্রান্তির গাজন পর্যন্ত অনুষ্ঠানের শেষ থাকে না। তারপরেই ১লা বৈশাখ বা নববর্ষের উৎসব।
রান্নাপূজা/আন্নাপূজা ও অরন্ধন – Ranna Puja, Anna Puja & Arandhan Ritual in Bengal
আন্ধন ঘর মানে রান্নাঘর — চব্বিশ পরগনার ভাষা। রন্ধন থেকে লোকমুখে আন্ধন হয়েছে। আন্নন ঘর, অর্থাৎ যে ঘরে রান্না করা হয়।
আন্না রান্না — আন্নাপূজা, রান্নাপূজা, অরন্ধন পূজা — একটি লোকাচার অনুষ্ঠান, যা ভাদ্র সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। অরন্ধনের আগের রাতে ভাত ও ভাজা ব্যঞ্জন তৈরি করে রাখা হয়, অরন্ধনের দিন তা খাওয়া হয়।
আন্নাপূজা ও অরন্ধনের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য – Regional Variations of Arandhan Festival in Bengal
আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের উপর ভিত্তি করে এই উৎসব বিভিন্ন নামে পরিচিত। উদাহরণস্বরূপ:
- হাওড়ায় এটি ঢেলাফেলা নামে পরিচিত।
- বাঁকুড়ায় খইধারা।
- বর্ধমানে খইদই।
- নদীয়ায় পাতালফোঁড়।
অরন্ধন উৎসবের বিবরণ – Arandhan Festival Ritual and Meaning
অরন্ধন বিশেষ বিশেষ দিনে রন্ধনবর্জনের প্রথা। পশ্চিমবঙ্গের অনেক পরিবারেই ভাদ্রের সংক্রান্তিতে এবং শীতলষষ্ঠীর দিনে (শ্রীপঞ্চমীর পরদিন) রান্না করা হয় না; দশহরা এবং শ্রাবণ মাসের শেষ দিনেও এই প্রথা এখনো বিভিন্ন জায়গায় পালন হয়। অরন্ধন উপলক্ষে আগের দিন রাতে রান্না করা বাসি ভাত খাওয়া হয়। শ্রাবণ সংক্রান্তির অরন্ধন অঞ্চলভেদে নানা নামে ডাকা হয়। যেমন, হাওড়ায় ‘ঢেলাফেলা’, বাঁকুড়ায় ‘খইধারা’, বর্ধমানে ‘খইদই’, নদীয়ায় ‘পাতালফোঁড়’। ভাদ্র-সংক্রান্তির অরন্ধনের অন্য নাম ‘রান্নাপূজা’। শীতলষষ্ঠীর অরন্ধন ‘গোটাসিদ্ধ খাওয়া’। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় রাজনৈতিক কারণে (বঙ্গভঙ্গ) আশ্বিনের সংক্রান্তিও অরন্ধন এবং রাখীবন্ধন দিবস রূপে ঘোষণা করা হয়েছিল।
ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে হুগলী জেলার সর্বত্র অরন্ধনের ব্যবস্থা আছে; অরন্ধনের অর্থ রন্ধনের অভাব। চলিত কথায় ইহাকে ‘আরন্দ’ বলে। অরন্ধনের আগের রাতে ভাত ও ভাজা ব্যঞ্জন তৈরি করে রাখা হয়, অরন্ধনের দিন খাওয়া হয়। অন্ন বাসি হইলে নষ্ট হয়ে যায় বলে তাহাতে জল দিয়ে পান্তাভাত করিয়া রাখতে হয়। ইলিশ মাছ ও ব্যঞ্জনের মধ্যে মসূর ডাল এবং কচুশাকই প্রধান। পরদিন আরন্দ। সে দিন উনুন জ্বলতে নেই। গৃহিণীরা উনুনের উপরে ও ভিতরে আলপনা দেন এবং ঘরে ঘরে মনসা পূজা করেন। আরন্দের দিন পরস্পর সকলেই সকলকে নিমন্ত্রণ করেন এবং সকলের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়ে বেড়ায়। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে যে আরন্দ হয়, তাহার নাম ‘বুড়ি আরন্দ’। আশ্বিন মাসের সংক্রান্তিতেও আরন্দের ব্যবস্থা আছে, তাহার নাম ‘ইচ্ছেরান্না’ বা ‘ইচ্ছারন্দ’।
ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অরন্ধনের সঙ্গে এই পূজার কোনো যোগ নাই। পক্ষান্তরে সমগ্র অনুষ্ঠানের সঙ্গে মনসা পূজার নিবিড় যোগ। অরন্ধনের পূর্বরাত্রে ভাত ও ভাজা ব্যঞ্জন প্রস্তুত হয়। এই রান্না, যা ‘পান্না’ নামে কথিত হয়, অরন্ধনের দিন ভোজন করা হয়। উনানের ভিতর ও বাহির লেপা-মোছা ও অলংকৃত করে একটি সিজ-মনসার ডাল বসিয়ে মনসা পূজা করা হয়। অরন্ধনের দিনের উদ্বৃত্ত রান্নাকে পরের দিন বলে ‘টক-পান্না’।
অরন্ধন: বাঙালি রন্ধন প্রথার ঐতিহ্য – Traditional Bengali No-Cooking Festival Food Culture
বিশ্বকর্মা পুজোর সময়কার অরন্ধন উৎসবে নিয়ম হল ভাদ্রে রেঁধে আশ্বিনে খাওয়া। এই দিন হল ভাদ্র মাসের সংক্রান্তি। আর এই ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতেই মা মনসার পূজোও দেওয়া হয়। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে মনসা পূজোর দিন যে অরন্ধন উৎসব পালিত হয়, তাকে অনেকে উনুন পুজো উৎসব বা গৃহদেবতার পূজো উৎসব বলেও ডাকেন। এই দিন বাড়িতে উনুন জ্বালাবার নিয়ম নেই। তাই আগের দিন রান্না করে সেই বাসি খাবার খাওয়ার রীতি আছে অরন্ধন উৎসবে।
এই দিন রান্নাঘরের একাংশ ভালো করে পরিষ্কার করে ফণীমনসার ডাল অথবা শালুক গাছের ডাল দিয়ে মনসার ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং যত্ন সহকারে পুজো করা হয়। এই দিন বিভিন্ন রান্না মাকে ভোগে দেওয়া হয়। যদিও এই রান্নাগুলি আগের দিন রাত্রে করা হয়ে থাকে। বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন থাকে অমাবস্যার রাত্তির, সেই সময় গৃহস্থের বাড়িতে উনুন জ্বালিয়ে রান্না পুজোর আয়োজন করা হয়।
হুগলী জেলায় প্রথম অরন্ধনটি হয় জ্যৈষ্ঠ মাসের দশহরায়; দ্বিতীয় শ্রাবণ সংক্রান্তিতে — যা ঢেলাফেলা উৎসব নামে পরিচিত; তৃতীয় অরন্ধন ভাদ্র মাসে, যা এই জেলায় চচ্চড়ি পূজো নামে খ্যাত এবং সবশেষের অরন্ধন হল রান্না পূজোর অনুষ্ঠান ভাদ্র-সংক্রান্তিতে। লক্ষণীয় যে, সব অরন্ধন অনুষ্ঠানেই সিজ মনসা গাছের ডালে দেবী মনসার পুজো হয়ে থাকে।
চাষীরা যাকে বলে ‘রান্না পূজো’ অথবা ‘পান্না’। ‘পান্না’ শব্দটি ‘পান্তা’র ভিন্ন রূপ। আলু, ছাঁচি কুমড়ো, কলা, পটল, নারকেল, বেগুন, কুমড়ো, কচুর শাক, নারকেল প্রভৃতি উপাদানের নানা ভাজা ও তরিতরকারি, শোল মাছের টক, নারকেল দিয়ে কচুশাকের ঘণ্ট, তিতোপুটি ভাজা, সরলপুটির ঝাল, ময়ামাছ আর বেগুনের ঝোল, চালবাটা দিয়ে ঢেকিশাক, পিটুলি দিয়ে পাট পাতার বড়া আর তালবড়া।
পান্তপালা: সাধারণত বছরে দুইদিন পান্তা ভাত খাবার নিয়ম। পত্রিকার ভাষায় অরন্ধন। প্রথম হল, ভাদ্র সংক্রান্তির দিন রেঁধে রেখে পরদিন ১লা আশ্বিন, ষষ্ঠী পুজায় ভোগ দিয়ে খাওয়া হয়। দ্বিতীয় হল, সরস্বতী পুজার দিন চৌদ্দ শাক দিয়ে নানারকম কলাই ও গোটা তরকারী (সংখ্যায় প্রতিটি ৫ অথবা ৭) সহ ব্যাঞ্জন ও ভাত রান্না করে পরদিন ষষ্ঠী-দেবীকে ভোগ দিয়ে খেতে হয়।
মূলত ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে করা অরন্ধন উৎসব হয় পিতৃপক্ষে। তারপর বাঙালি অপেক্ষা করে থাকে দেবীপক্ষের জন্য। দেবীপক্ষ এলেই বাঙালিদের বাড়িতে আয়োজন শুরু হয়। বাঙালি আবার উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। তাই বলা যায় ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে অরন্ধন উৎসব হল দুর্গাপুজোর আগে বাঙালিদের করা শেষ উৎসব।
সাধারণ কচুর এক বিশেষ ভূমিকা পুজোতে – Importance of Taro (Kochu) in Bengali Ritual Food
তাহলে দেখা যাচ্ছে কচু খাবার দুটো ব্রত বা পুজো বাংলায় প্রচলিত — রাধাঅষ্টমী ও রান্না পুজো। বাংলায় অনেক ধরণের কচু পাওয়া যায়। অনুমান করা হয়, কচুর উৎপত্তি ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। প্রায় দু'হাজার বছর আগেও কচুর চাষ হত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। জলে আর জঙ্গলে উভয় জায়গায় কচু জন্মাতে পারে। তবে স্থলে জন্মানো কচুর সংখ্যাই বেশি। বনে জঙ্গলে যেসব কচু আপনাআপনি জন্মায় সেগুলোকে সাধারণত বুনো কচু বলা হয়। এর সবগুলো মানুষের খাবারের উপযোগী নয়। খাবার উপযোগী জাতগুলোর অন্যতম হচ্ছে মুখীকচু, জলকচু, পঞ্চমুখী কচু, ওলকচু, দুধকচু, মানকচু, শোলাকচু, গাটি কচু, খারকোল ইত্যাদি। কচুর বহু আয়ুর্বেদীয় গুণাগুণ আছে বলে দাবি করা হয়। প্রজাতিভেদে কচুর মূল, শিকড় বা লতি, পাতা ও ডাটা সবই মানুষের খাদ্য।
“অকালে খেয়েছ কচু, মনে রেখ কিছু কিছু” —---- সুখের দিনে অতীতের দুঃখের দিনের কথা মনে রাখতে হয়
মুখী কচু
মুখী কচু বাংলাদেশের গুঁড়া কচু, কুড়ি কচু, ছড়া কচু, দুলি কচু, বিন্নি কচু, ইত্যাদি নামে ও পরিচিত। মুখী কচুতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন ‘এ’ এবং লৌহ থাকে, রাতকানা রোগ প্রতিরোধে এটি অত্যন্ত উপকারী। মুখী কচু একটি সুস্বাদু সবজি। এ সবজি খারিফ মৌসুমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই এর চাষ হয়।
ওলকচু
এতে পুষ্টি ও ঔষধি মূল্য উভয়ই বিদ্যমান এবং সাধারণত রান্না করে তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়। বাংলাদেশে এটি গ্রীষ্ম মৌসুমে জন্মে যখন বাজারে সবজির খুব ঘাটতি থাকে। ওল কচুর রস, উচ্চরক্তচাপের রোগীকে প্রতিষেধক হিসেবে খাওয়ানো হয়।
মান কচু
মান কচুর ডগা ও পাতা বাতের রোগীকে খাওয়ানোর প্রথা এ দেশের ঘরে ঘরে প্রচলিত রয়েছে। কচু শাকে পর্যাপ্ত আঁশ থাকায় এটি দেহের হজমের কাজে সহায়তা করে।
জল কচু
সারাদেশে পানি কচু বা জল কচুর বিভিন্ন নাম রয়েছে যেমন নারিকেল কচু, জাত কচু, বাঁশকচু ইত্যাদি। সবজি হিসেবে পানি কচুর গুরুত্ব ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বাঙালি মাত্রেই এটি একটি জনপ্রিয় সবজি। কারণ এর স্বাদ এবং পুষ্টিমানও অত্যধিক, রান্না করাও সহজ।
কচু দিয়ে রান্না – Traditional Bengali Recipes with Taro (Kochu)
প্রজাতিভেদে কচুর মূল, শিকড় বা লতি, পাতা ও ডাটা সবই মানুষের খাদ্য। কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ অনেকেরই খাদ্য তালিকায় পছন্দের মধ্যে আছে। এছাড়াও কচুর লতি চচ্চড়ি, কচুর লতির ভুনা, কচুর লতির ইলিশ, কচুর লতির কোরমা, সরিষা বাটায় কচুর লতি — আরও কত রকমের খাবার যে রান্না করা যায় তার ইয়ত্তা নেই।
‘বান’ মহাশ্বেতা দেবীর ছোট গল্পে বিবরণ পাই – Literary Reference to Arandhan in Bengali Culture
"ভাদ্রমাসে রান্নাপূজার দিন এসেছে, এ সময়ে গৃহস্থমাত্রেই মনসাগাছ খোঁজে। রূপসী বাগদিনীর ছেলে চিনিবাস মনসাগাছ খুঁজতে গেল। মনসাগাছ নিয়ে পূর্বস্থলীর গৃহস্থরা উঠোনে পোঁতে। মনসা বাস্তু। মনসা ক্ষেতে ধান, গাইয়ের পালানে দুধ, পুকুরে মাছ, গৃহস্থ বউয়ের কোলে ছেলে দেন। কিন্তু ঘরে ঘরে মনসাগাছ থাকে না। রান্নাপূজার পরদিন অরন্ধন। শোল মাছের টক, নারকেল দিয়ে কচুশাকের ঘন্ট, তিতোপুঁটি ভাষা, সবলশুঁটির ঝাল, ময়ামাছ আর বেগুনের ঝোল, চালবাটা দিয়ে ঢেঁকিশাক, পিটুলি দিয়ে পাট পাতার বড়া আর তালবড়া। পরদিন দু'বেলা ধরে চিনিবাস তাই খেয়েছিল।"
You might be interested in The Top 13 Traditional Edible Green Dishes of Bengal
শীতল-ভোগ কোনটি – What is Shital Bhog in Bengali Ritual Food Tradition
‘শীতল’ শব্দটি রাঢ় বাংলার। স্থানীয়ভাবে দেবদেবীর ভোগ হিসেবেও ঠাণ্ডা খাদ্য উৎসর্গ করার নাম ‘শীতল-ভোগ’। দক্ষিণ ২৪ পরগণার জনপ্রিয় লোকাচার ‘রান্নাপূজা’ এবং রাঢ়ের জনপ্রিয় লোকাচার অরন্ধন বা শীতল — এইরকম একটি অভিপ্রায়কেই নির্দেশ করে। আগের রাত্রে রান্না করে পরের দিন খাওয়ার রীতি।
হাওড়া জেলার এক লোকউৎসব হল মনসা পূজা এবং তাকে কেন্দ্র করে গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে হয় অরন্ধন উৎসব। এ জেলায় প্রথম অরন্ধনটি হয় জ্যৈষ্ঠ মাসের দশহরায়; দ্বিতীয় শ্রাবণ সংক্রান্তিতে — যা ঢেলাফেলা উৎসব নামে পরিচিত; তৃতীয় অরন্ধন ভাদ্র মাসে, যা এই জেলায় ‘চচ্চড়ি পূজো’ নামে খ্যাত এবং সবশেষের অরন্ধন হল রান্না পূজোর অনুষ্ঠান ভাদ্র-সংক্রান্তিতে। লক্ষণীয় যে, সব অরন্ধন অনুষ্ঠানেই সিজ মনসা গাছের ডালে দেবী মনসার পুজো হয়ে থাকে। পূজায় এইসব ভোজ্য নিবেদন করা হয়। কয়েকটি বিশেষ ব্যঞ্জনের মধ্যে থাকে নারিকেল কুমড়ি, কচুশাক ঘন্ট, নারিকেল ভাজা, সজিনাশাক ভাজা, ওলভাজা, জমাটবাধা ডাল ও ইলিশমাছ ভাজা। এই অরন্ধন উৎসব বাংলার বহু অঞ্চলে সমারোহের সঙ্গে পালন হয়।
আরন্পালা অরন্ধন [অন্তত দুই প্রকারের শাক অরন্ধন ও ভাত অরন্ধন]। ছয়-সাত রকমের শাক রাত্রে রান্না করা হয়। পরের দিন সকালে শুধু ভাত রেঁধে এ বাসি শাক সহযোগে খাওয়া হয়। এটি অনুষ্ঠিত হয় শ্রাবণ মাসে মনসাপূজার সময়। আর ভাদ্রমাসের যে-কোনো একদিন, মঙ্গলবার অগ্রগণ্য, ভাত অরন্ধন করা হয়।
লোকাচার ও লোকায়ত সংস্কৃতি – Bengali Folk Culture and Ritual Practices
ভাদ্র সংক্রান্তির অরন্ধনের দিনে উনুনের ভিতর সিজ বা মনসা গাছের ডাল রেখে সাধারণত মনসা পুজা করার রীতি। মনসাদেবীর সাপ এদিনে বৃষ্টি ও জলের উপদ্রব থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য নানা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করে — উনুনের গর্ভেও গিয়ে লুকোয় সে। এ দিনে উনুনের লুক্কায়িত সাপেরা যাতে নিরাপদে বিশ্রাম করতে পারে তার জন্যই অরন্ধনের সূত্রপাত বলে কিছু লোক মনে করেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে বিশ্বকর্মা পুজা উপলক্ষে সমস্ত যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ায় রন্ধন সামগ্রীর ব্যবহারও লোকাচার অনুযায়ী নিষিদ্ধ, যার ফলে অরন্ধন প্রতিপালন না করে উপায় থাকে না।
উপাচার – Ritual Offerings and Traditional Food Preparation in Arandhan
নতুন মাটির হাড়িতে আতপ চালের ভোগ রান্না হয়। এই হাড়িকে বলে ভোগের হাড়ি। পরদিন অরন্ধন পুজা। সকালে ভোগ-রান্নার উনোন পরিষ্কার করে মনসা গাছের ডাল এনে বসিয়ে রাখতে হবে। ভোগের হাঁড়ির গলায় পরিয়ে দিতে হবে খাল-পুকুর থেকে তুলে আনা শাপলার মালা। এরপর শাপলার পাতায় নিবেদিত হবে অষ্টনাগের উদ্দেশে ভোগনৈবেদ্য। ভোগের হাঁড়ি থেকে আতপচালের পান্তার সঙ্গে রান্না করা সব আমিষ ও নিরামিষের পদ আটটা শাপলা পাতায় সাজিয়ে অষ্টনাগকে নৈবেদ্য দেওয়া হয়। ফলমূল ও মিষ্টি-মিঠাইয়ের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। মনসা পুজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, গৃহস্থ মহিলারা পৌরোহিত্য করেন এই পুজোয়। পুজোর পর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অতিথি-অভ্যাগত, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখীদের কলাপাতা পেতে পেটপুরে অরন্ধন পুজার পান্তাসহ বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু ব্যঞ্জন খাইয়ে তৃপ্তি পান গৃহস্থ ভক্তগণ। এই ভোজের জন্য বাড়তি ভাত ও ব্যঞ্জন প্রস্তুত করা হয় ভোগ রান্নার সঙ্গে। রান্না-পুজোর বিভিন্ন ধরণের ভাজা, কুমড়ো-চিংড়ির ঘন্ট, মাছ, চালতার চাটনি, পায়েস, পিঠে, পাকা কলার বড়া ভাজা, পান্তা-ডাল, চচ্চড়ি, ইলিশ ভাজার প্রতি আকর্ষণ নেই এমন মানুষ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় বিরল। মনসা পুজার ব্যাপকতায় বহু গ্রামনাম ও স্থাননামের সৃষ্টি হয়েছে জেলায়। মনসাতলা, মনসাবাড়ি, মনসাডাঙা, মনসার বেড়, মনসা দাঁড়ি প্রভৃতি নামে বহু আবাদি খেত-খামার, গ্রাম ও মৌজার সন্ধান মেলে জেলায়। গঙ্গাসাগর দ্বীপের একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল মনসাদ্বীপ নামে সুপরিচিত।
অরন্ধনকে রন্ধন ধর্মঘট বা রান্না বন্ধও বলা যেতে পারে। বিশ্বকর্মা পুজো উপলক্ষে কলকারখানা বন্ধ থাকার জন্য এদিনে বাঙলার পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে নারী সমাজেরও ছুটি। এই ধরণের কোনদিন ছাড়া অর্থাৎ অরন্ধন ছাড়া অন্য কোন উৎসব বা অনুষ্ঠানে আমরা আমাদের নারী সমাজকে বিশ্রাম বা ছুটি দিতে পারি না। অরন্ধন লোকায়ত অনুষ্ঠান।
ভাদ্র সংক্রান্তির অরন্ধনে যে উনুন পুজা অনুষ্ঠিত হয় তাতে সপ্তপত্রির বদলে মনসা বা সিজ ডালের প্রয়োজন হয়। উনুনের চারদিকে আলপনা দেওয়া হয়। অনেক জায়গায় এই পুজোতেও উনুনের চারপাশে সাতটি মনসা পাতার উপর সাতটি অন্নভোগ দেবার রীতি আছে। পুজান্তে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবারও প্রথা আছে। এই নিমন্ত্রণে খাওয়ানো হয় পান্তা ভাত ও বাসি তরকারি।
বঙ্গভঙ্গের ও অরন্ধন – Arandhan as Political Protest During Bengal Partition (1905)
তাই ১৯০৫ সনের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন উপলক্ষে আশ্বিন সংক্রান্তি (১৬ই অক্টোবর — ৩০শে আশ্বিন) ব্রিটিশ সরকার যখন বঙ্গভঙ্গের দিন ঘোষণা করলেন তখন সারা বাঙলার এ দিনটিকে ক্ষোভ ও দুঃখের প্রতীক করে তোলার আয়োজন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গমিলনের দাবিতে ‘রাখীবন্ধন’ এবং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ‘অরন্ধন’ পালন করতে প্রস্তাব আনলেন। রাজনৈতিক সমাজ এ প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করলেন। শোকচিহ্নস্বরূপ আশ্বিন সংক্রান্তি বা ৩০শে আশ্বিন প্রতিপালিত হল অরন্ধন দিবস রূপে। এই অরন্ধনের সঙ্গে ধর্মের অরন্ধনের কোন যোগ ছিল না। এই অরন্ধন ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে। তাই বলা হয়েছিল শিশু ও রোগী ব্যতীত এ দিনে কেউই অন্নজল গ্রহণ করবেন না, সকলেই খালি পায়ে থাকবেন। কোন বাঙালীর ঘরে উনুন ধরবে না। সব বন্ধ, সব ধর্মঘট। এইভাবেই ধর্মাচরণের অঙ্গ অরন্ধন, উপবাস প্রভৃতি কালক্রমে ট্রাডিশন থেকে রাজনৈতিক লড়াই-এর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় উপবাস থেকে এসেছে অনশন।
প্রতিবাদ এবং শোকে অরন্ধন – Arandhan as a Symbol of Protest and Mourning in Bengal
তারও আগে ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে ৫ই আগষ্ট — এদিন নন্দকুমারের ফাঁসির দিন ধার্য হয়। দেশের অনেক গণ্যমান্য লোক, বাঙলার নবাবও ফাঁসির আদেশ রদ করার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু হেস্টিংস কারও কথায় কর্ণপাত করেননি। নন্দকুমারের ফাঁসির দিন কলকাতার প্রত্যেক হিন্দু পরিবারে অরন্ধন পালিত হয়।
লৌকিক সংস্কৃতি কখন বৈদিক সংস্কৃতিতে – Folk Culture Influence on Vedic Traditions in Bengal
অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ধর্মীয় সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত ছিল পরজীবনে বিশ্বাস, পিতৃপুরুষদের পুজা, কৃষি সম্পর্কিত অনেক উৎসব যেমন পৌষপার্বণ, নবান্ন প্রভৃতি, মেয়েদের দ্বারা পালিত অনেক ব্রত এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে চালু ছিল। বাংলার আদিম অধিবাসীদের ধর্মে পালন হত মৃত্যুর পরে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস, মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, মন্ত্রাদি, প্রাকৃতিক শক্তিকে মাতৃরূপে পূজা, লিঙ্গ পূজা, কুমারী পূজা, টোটেমের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা এবং গ্রাম, নদী, বৃক্ষ, অরণ্য, পর্বত ও ভূমির মধ্যে নিহিত শক্তির পূজা। মানুষের ব্যাধি ও দুর্ঘটনাসমূহ দুষ্ট শক্তি বা ভূত-প্রেত দ্বারা সংগঠিত হয় বলে বিশ্বাস ও বিবিধ নিষেধাজ্ঞা, অনুশাসন ইত্যাদি নিয়ে বাংলার আদিম অধিবাসীদের ধর্ম গঠিত ছিল। এবং সেগুলি হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক ধর্মকর্মে পরিণত হয়েছিল।
বস্তুত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনেক পূজা-পার্বণের অনুষ্ঠান যেমন দুর্গাপূজার সহিত সংশ্লিষ্ট নবপত্রিকার পূজা ও শবরোৎসব, নবান্ন, পৌষ-পার্বণ, হোলি, ঘেটুপূজা, চড়ক, গাজন প্রভৃতি এবং আনুষ্ঠানিক কর্মে চাউল, কলা, কলাগাছ, নারিকেল, সুপারি, পান, সিঁদুর, ঘট, আলপনা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, গোময় এবং পঞ্চগব্যের ব্যবহার — ইত্যাদি সবই আদিম অধিবাসীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে আরও নেওয়া হয়েছিল আটকৌড়ে, শুভচনী পূজা, শিশুর জন্মের পর ষষ্ঠী পূজা, বিবাহে গাত্র হরিদ্রা, পান খিলি, গুটিখেলা, স্ত্রীআচার, লাজ বা খই ছড়ানো, দধিমঙ্গল, লক্ষ্মীপূজার সময় লক্ষ্মীর ঝাঁপি স্থাপন, অলক্ষ্মীপূজা ইত্যাদি আচার-অনুষ্ঠান, যা বর্তমান কালেও বাঙালি হিন্দু পালন করে থাকে। এ সবই প্রাক-আর্য সংস্কৃতির অবদান। এছাড়া নানা রূপ গ্রাম্য দেব-দেবীর পূজা, ধ্বজা পুজা, বৃক্ষের পূজা, বৃষকাষ্ঠ, যাত্রা জাতীয় পর্বাদি যেমন স্নানযাত্রা, রথযাত্রা, ঝুলনযাত্রা, রাসযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি এবং ধর্মঠাকুর, চণ্ডী, মনসা, শীতলা, জাগুলী, পর্ণশবরী, প্রকৃতি পূজা ও অম্বুবাচী, অরন্ধন ইত্যাদি সমস্তই আমাদের প্রাক-আর্য জাতিসমূহের কাছ থেকে নেওয়া।
ভারতীয় আদিবাসী সমাজ সংস্কৃতি যে বহু প্রাচীন, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এই আদিবাসী সংস্কৃতির ভিত্তিমূলের উপর গড়ে উঠেছে আর্য সভ্যতার আধুনিক ইমারত। তাই স্বভাবতই আদিবাসী সংস্কৃতির বহু উপকরণই এই ইমারতের অঙ্গীভূত হয়ে আছে। বাংলার তথা বাঙালির পুজা-পার্বণ, উৎসব-অনুষ্ঠান, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, ধর্ম-শিল্পকলা তার প্রত্যক্ষ নিদর্শন। দীর্ঘকাল একে অপরের সাথে সহাবস্থান করার ফলে তাঁদের মধ্যে যেমন ভাবের আদান-প্রদান হয়েছে, তেমনি সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং প্রভাবের ক্ষেত্রটিও অতি সুপ্রাচীন ও সুসম্পর্কবদ্ধ।
এবং বিশ্বকর্মা পুজা – Significance of Viswakarma Puja in Bengali Cultural Life
শিল্পবিজ্ঞান-এর নৈপুণ্য বৃদ্ধির জন্য ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মাদেবের পুজার বহুদিন ধরে বাংলা দেশে প্রচলিত আছে। বিশ্বকর্মা পুজার দিন ঘুড়ি ওড়ানো ছিল একটা প্রধান কাজ। আগেকালে ধনী বাঙালী বাবুর দশ টাকার ও একশো টাকার নোট ঘুড়িতে বেঁধে ঘুড়ি ওড়াতেন। সেই নোটবাঁধা ঘুড়ি ধরবার জন্য চলতো ভীষণ প্রতিযোগিতা। এখনও সেই ঘুড়ি ওড়াবার দিন হিসাবে বিশ্বকর্মা পুজার দিনটি ছেলেদের কাছে খুবই প্রিয়।
আমাদের দেশে ঘুড়ির প্রকারভেদে ভোমরা, ঘয়লা, দ্য-ঘরলা, ঢাউস, চিলে, পতঙ্গ (খুব ছোট ঘুড়ি), তেলাঈ, বামন, পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা, বুলুম, ময়ূরপঙ্খী, শতরঞ্চ, চাপরাশ, মুখপোড়া, উলটো মুখপোড়া, মাছিয়াল, ঝুমকো, দোভাঁজ, ক্রস ইত্যাদি কত নামের ঘুড়ি এখনও বিশ্বকর্মা পুজার দিন আকাশে ওড়ে।
এই শহরেও ময়দানে একসময় আয়োজিত হয়েছে ‘ঘুড়ির লিগ’। ঘুড়ি প্রেমীদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল ‘ক্যালকাটা কাইট অ্যাসোসিয়েশন’। প্রতিযোগিতা হয়েছে বাংলা, বাইরেও। চিনা মাঞ্জার কারণে ঘুড়ি এখন নিয়ন্ত্রিত। তবু থেমে নেই। বিশ্বকর্মার সঙ্গে একাত্ম হয়েছে ঘুড়ি। দমদম, হাতিবাগানে অতএব জমজমাট ঘুড়িবাজার।
মহাভারতে আছে বিশ্বকর্মা কেবল দেবশিল্পীই নন, ইনি তাঁদের অস্ত্রাদিও নির্মাণ করেন। ইনি শিল্পের শ্রেষ্ঠ কর্তা; যিনি দেবতাদের বিমান-নির্মাতা এবং অলংকারশিল্পী। ইনি সর্বপ্রকার কারুকার্য নির্মাতা এবং কারিগর-শিল্পীদের রক্ষক। তাই যারা শ্রমজীবী এবং বৃত্তিজীবী তাদেরই দেবতা ইনি।
প্রতি বছর ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিন হাজার হাজার কলকারখানায় খুব ধুমধামের সঙ্গে বিশ্বকর্মা পুজো করে শ্রমজীবী মানুষরা। জমজমাট দিন দুটো যে কোথা দিয়ে কেটে যায় বোঝা যায় না। শ্রমিক-মালিকে ভেদ থাকে না। এই দিনটাতেই একমাত্র ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র কারখানার মালিকরাও নিজেদেরকে শিল্পপতি অনুভব করতে পারে।
দেবতার বিশেষ মর্যাদা, কারণ গরিব মানুষরা পুজো, নিজেদের অনুষ্ঠান আর নিজেদের নিয়মে চলেন; কারুর দয়া বা অনুগ্রহে, অর্থ সংগ্রহ হোক — এই পুজো তারা করেন না। ছোট ছোট কারখানা, অপরিসর নোংরা জায়গায় কাজ করতে অভ্যস্ত মানুষগুলো নিজেদের সামর্থ্যে, ইচ্ছায়, আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটু জায়গায় অল্প আয়োজনে নিষ্ঠা সহকারে পুজোর আয়োজন করেন। কারখানার মধ্যে গাদাগাদি করে পড়ে আছে যন্ত্রপাতি, নানা মাপের নানা আকারের মেশিন।
পুজোর আগের দিন বিকেল থেকেই সব কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সব ঘরেই মেশিনের ঠুকঠাক বন্ধ এই দুই দিন। শ্রমিক কারিগররা তাদের নিজের যন্ত্রপাতিগুলো ঝাড়াপোঁছা করে। তাদের গায়ে ফুলের মালা পরায়। কারখানার দোরগোড়ায় ঘটের মধ্যে নবপত্রিকা রাখা হয়। মালিকরা পটুয়া পাড়ায় গিয়ে পছন্দমত মূর্তি কিনে আনে। যাদের ব্যবসার ঘটা বেশি তাদের ঠাকুরও তত বড়। জাঁকজমক এবং জেল্লা দেখবার মতন। যথেষ্ট দাম দিয়েই তারা প্রতিমা কেনে।
এক রাতের মধ্যেই ঘরে ঘরে আলো জ্বলে। ফুলের মালা আর ধূপের ধোঁয়ায় ভরে ওঠে অলিগলি। সারা রাত ধরে রান্না হয়, কারণ পরের দিন উনুনেরও ছুটি। পরদিন ভোর থেকেই সবাই মেতে ওঠে উৎসবের খুশীতে। আজ আর মেশিনের শব্দ নেই। ঢাকের বাদ্য শোনা যাচ্ছে, পুরোহিত মশাই প্রতিটা মণ্ডপে আর ঘরে ঘুরে ঘুরে পুজো করছে। এক হাতে ঘণ্টা, অন্য হাতে উপাচার। শ্রমিকের হাতের সব যন্ত্রই যেন দেবতার আশীর্বাদ পেয়ে ধন্য হচ্ছে।
বিশ্বকর্মা পুজোকে আমরা ছোটবেলা থেকে বলে এসেছি ‘রিকশা পুজো’। কারণ কলকাতার সাধারণ মানুষের সরাসরি রোজকার সম্পর্ক এদের সাথে। অন্য কলকারখানায় যেমন সমারোহ করে পুজা-উৎসব হয়, রিক্সামালিক এবং চালকদের পুজোতেও তেমনই ধুমধাম আর আড়ম্বর হয়। পূজোর আগের দিন সব রিকশাওলারাই যত্ন করে গাড়ি ঝাড়াপোঁছা করে। গাড়ির গায়ের আঁচড়ের দাগগুলো রঙ দিয়ে ঢেকে, চাকার গর্তে খানিকটা সরষের তেলের ফোঁটা ফেলে দেয়, যাতে অবাঞ্ছিত ঘড়ঘড় শব্দে দেবতা ও সওয়ারী বিরক্ত না হন। দুই দিন পুরো বিশ্রাম গাড়ি দেবতার।
Reference:
১. দুর্গাচরণ সান্যাল. বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস (প্রথম সংস্করণ). কলকাতা : মডেল পাবলিশিং হাউস, ১৯০৮, পৃ ২
২. ডঃ অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন (চতুর্থ সংস্করণ). কলকাতা : সাহিত্যলোক, ২০১২, পৃ. ২১
৩. পরিমল হেমব্ৰম. সাঁওতালি ভাষা-চর্চা ও বিকাশের ইতিবৃত্ত (প্রথম সংস্করণ). কলকাতা : নির্মল বুক এজেলী, ২০১০, পৃ. ৩৪
৪. Edible Medicinal and Non Medicinal Plants: Volume 9, Modified Stems, Roots ... By T. K. Lim Link
In summary, Arandhan is not just a ritual of not cooking but a reflection of Bengal’s agrarian lifestyle, community bonding, and deep-rooted cultural memory connected with Viswakarma Puja and seasonal transitions.
জেনে রাখুন – বিশ্বকর্মা পূজা, রান্নাপুজো ও অরন্ধন
বিশ্বকর্মা পূজায় ঘুড়ি ওড়ানো হয় কেন?
বিশ্বকর্মা পূজার দিন আকাশে ঘুড়ি ওড়ানো একটি জনপ্রিয় রীতি। এটি আনন্দ, উৎসব এবং আকাশের সঙ্গে সংযোগের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, বিশেষ করে কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের মধ্যে।
Kite flying during Vishwakarma Puja symbolizes celebration, freedom, and connection with the sky.
বিশ্বকর্মা পূজা কারা করেন?
বিশ্বকর্মা পূজা মূলত কারিগর, শিল্পী, মিস্ত্রি, কারখানার শ্রমিক এবং যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত মানুষরা পালন করেন। এটি কর্ম ও সৃষ্টির দেবতা বিশ্বকর্মার আরাধনা।
Vishwakarma Puja is observed by artisans, workers, and those associated with tools and machinery.
অরন্ধন কী?
অরন্ধন হল এমন একটি দিন, যেদিন নতুন করে রান্না করা হয় না। আগের দিন রান্না করা খাবার খাওয়া হয়, যা একদিকে আচার এবং অন্যদিকে একটি সামাজিক প্রথার প্রতীক।
Arandhan refers to a traditional day when no cooking is done and previously prepared food is consumed.
রান্নাপুজো কী?
রান্নাপুজো হল বিশ্বকর্মা পূজার আগের দিন, যেদিন নানা ধরনের খাবার রান্না করে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় এবং পরের দিন অরন্ধন পালন করা হয়।
Ranna Puja is observed a day before Vishwakarma Puja, when various dishes are prepared for offering and next-day consumption.
বিশ্বকর্মা পূজায় গাড়ির পূজা কীভাবে করা হয়?
এই দিনে অনেকেই তাদের গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও কর্মস্থলের উপকরণ পরিষ্কার করে ফুল, চন্দন, ধূপ-দীপ দিয়ে পূজা করেন। এটি নিরাপত্তা ও সাফল্যের কামনায় করা হয়।
Vehicles and tools are cleaned and worshipped during Vishwakarma Puja for safety and prosperity.