Home / Traditional Bengali Recipes / শাক দিয়ে মাছ ঢাকা: ঠাকুমার হারানো রেসিপি ও বাবার রান্নার রসায়ন

শাক দিয়ে মাছ ঢাকা: ঠাকুমার হারানো রেসিপি ও বাবার রান্নার রসায়ন

Food and Cooking Inspiration

শাক দিয়ে মাছ ঢাকা

ঠাকুমার রেসিপি ও বাবার রান্নার কেমিস্ট্রির গল্প

এটা সত্যিই একটা খুব অপরিচিত রান্না—আমার ঠাকুমার রেসিপি। উনি অধুনা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মেয়ে ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে প্রথম আসামে যান, তারপর চব্বিশ পরগনার স্থায়ী ঠিকানা।
ঐতিহ্যবাহী কম তেল-মশলার 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা' চচ্চড়ি

আমার বাবা ছিলেন ডেলিবারেট কুক। ছোটবেলা থেকেই ওনার বাড়িতে থাকা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু যখনই রান্না করতেন নিজেদের পুরোনো স্বাদকে অক্ষুণ্ণ রেখে করতেন, কোনও নিয়মের ধার ধারতেন না। আমাকে নিয়ে বাজার যেতেন। খুব খোঁজ রাখতেন এখন কী ঋতু আর কী পুজো। অর্থাৎ বাজারে সদ্য ওঠা কোন শাক বা সবজি যা কিনা পুজোর নিবেদন হবে বলে বাজারে পাওয়া যাবে।

রান্নাঘর ছিল ওনার গবেষণাগার

আমাকে যখন বাজার করতে বলতেন কী কী আনতে হবে, তখন থেকে এখন খেয়াল করি উনি মনে মনে ঠিক করে নিতেন কী রান্না করতে চলেছেন। রান্নার নাম বলতেন না কোনও—শুধু তরকারি, ভাজা, ঝোল আর মাখা সেই সবজি বা জিনিসের। সবকিছু যেন এক কেমিস্ট্রি ওনার কাছে!

শারীরিক কিছু কারণে কম তেল আর অল্প মশলার রান্নার পক্ষপাতী ছিলেন। আর দিতেন ফুটন্ত গরম জল। এটা মা এবং বাবার একদম স্থির সিদ্ধান্ত ছিল—কখনও ঠান্ডা জল রান্নায় দেননি সারা জীবন।

বর্ষায় আমাদের ছোটবেলায় শাক খাবার চল ছিল না বাড়িতে। মাঠে নোংরা জল মিশে যাওয়া, পাতায় পোকার ডিম পাড়া ইত্যাদিকে এড়িয়ে চলতেন। শুধু কচু পাতা আর শাক এই সময় খুব আসত।

দুর্গাপুজোর সময় থেকে শাক খাওয়া শুরু হতো, আর লক্ষ্মীপুজোর পর থেকে সেই চোদ্দ শাক খাওয়া। শুধু মনে করে ভূত চতুর্দশীর আগে বাজারে গিয়ে বলতেন—"যে যতগুলো পারবে আলাদা করে আনবে।" ওই মিশিয়ে বাজারে যে ঘাসের পাতা বস্তা করে চোদ্দ শাকের নাম করে আসে, তা কোনওদিন আমাদের বাড়িতে স্থান পায়নি। বাবা বলতেন—চোদ্দ শাক খাবার নিয়ম তো এই কারণেই তৈরি যাতে এই ঔষধি শাকগুলো বছরে অন্তত একবার খাওয়া হয় এবং মাঠ ও বাজারের ডিমান্ড-সাপ্লাই চেইনটা বজায় থাকে।

এই সময় যতগুলো শাক ভালোভাবে আলাদা করে পেতেন, তা দিয়ে একটা তেতো রান্না হতো। বাবা বছরে অন্তত একবার নিজের বাড়ির মা ও ছোটবেলাকে উদ্‌যাপন করার জন্য এটা রান্না করতেনই।

ভেটকির তেল দিয়ে তেঁতো শাকের রন্ধনপ্রণালী

ভেটকি মাছ কেনার পর তেলটা খাবার সময় ওনার কোনও রেস্ট্রিকশন মাথায় থাকত না। কারণ ভেটকির তেল দিয়েই রান্না হবে তেঁতো শাক। যে বার যেমন শাক পেতেন তাই দিয়েই হতো, তবে ওনার লক্ষ্য থাকত—কুলেখাড়া, কচি মুলো সমেত মুলো শাক, আর জিভের আরামের জন্য এক মুঠো কচি পালং।

ভেটকির কাঁটা আর মাথা মাছের তেলটা দিয়ে একটু পোড়া পোড়া করে ভেজে নিতেন। মা ওই কম তেলে মাছ ভাজার গন্ধ সহ্য করতে পারতেন না বলে বাবা আগে অল্প তেলে একমুঠো শুকনো লঙ্কা আর তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে নিতেন।

মাছ ভাজা হলে সেগুলো তুলে পাঁচফোড়ন দিতেন। এরপর শাক, স্বাদমতো নুন এবং দুই-চার দানা মিষ্টি দিয়ে শাকটা কষিয়ে নিতেন। এবার চেরা কাঁচা লঙ্কা ও ভেজে রাখা মাছের কাঁটাগুলো দিয়ে ওপর থেকে দিতেন ডুমো করে কাটা বেগুন, তারপর ঢাকা দিয়ে দিতেন। কম আঁচে রান্না হতো বেগুন নরম হয়ে যাওয়া অবধি।

জরুরি সতর্কতা: শাক অবশ্যই প্রথমে ধুয়ে, বেছে, আবার ধুয়ে, তারপর হালকা গরম জলে ধুয়ে নিতেন। বেগুন ভাজার জন্য বা এই রান্নায় অতিরিক্ত তেল দেওয়া বারণ—ওই নামমাত্র শুরুতেই যা তেল আইডিয়ালি 'মাছের তেলে মাছ ভাজা'। না হলে এটা বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাঁটি 'চচ্চড়ি' অথবা 'সরসরি' হবে না।

বাবা বলতেন—এ হলো পুরোনো দিনের "শাক দিয়ে মাছ ঢাকা" রান্না। কারণটা জানলেও আমি আজ বলছি না, সনাতনীরা সহ্য করতে পারবে না [অল্প বয়েসী বালিকারা বয়েসসন্ধিতে পৌঁছনোর আগেই যে বালিকা বিধবা হতো আর তাকে জোর করে সমাজের ক্রুরতা কে বজায় রাখানোর চেষ্টা হতো তাদের তো কেউ কেউ প্রাণের থেকে অধিক, নিয়মের উর্দ্ধে ভালোও তো বাসতো ! ] । বাবার অনন্য টিপসটা এই ক্ষেত্রে খুব ইন্টারেষ্টিং । সাইন্স রিপোর্টার পড়ে আর নিজের ইমাজিনেশনস আর ইন্টুইশন্স দিয়ে বাবা এই শাক রান্না গুলোতে অবশ্যই আমচুর দিতেন। [সাইন্স রিপোর্টার এর নিয়মিত পাঠক ছিলেন ৮৩ বছর বেঁচে ছিলেন ] |

আবার মায়ের এই এক্সপেরিমেন্টাল রান্না গুলো খুব একটা পছন্দ ছিল না । মা ছিলেন রিচুয়ালিস্টিক ট্রাডিশনাল রাঁধুনি, ঐতিহ্য কে ধরে রাখায় ওনার একটা স্থির আবেগ ছিল বলতে পারি ।

বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া কিছু অমূল্য কিচেন টিপ্স:

  • গরম জলের ব্যবহার: রান্নায় স্বাদের বাঁধুনি ধরে রাখতে সবসময় ফুটন্ত গরম জল ব্যবহার করা।
  • মিষ্টির ভারসাম্য: পায়েস বা মিষ্টি খাবারে একগাদা চিনি না দিয়ে নখের ডগায় সামান্য লবণ দিলে মিষ্টির খোলতাই বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • মাংসের কেরামতি: মুরগির ঝোলে নামমাত্র সর্ষে বাটা দিলে খাসির মাংসের মতো সোঁদা গন্ধ আসে; আর পাঁঠার ঝোলে একটু হিং দিলে অতিরিক্ত মশলা ব্যবহারের প্রয়োজনই পড়ে না।
  • কষানোর নিয়ম: আদা বা দই তেলে দিয়ে সরাসরি রান্নার সময় গ্যাস বন্ধ করে কিছুক্ষণ রেখে আবার জ্বালিয়ে কষালে আদা তেতো হয় না আর দই মশলা ছানা কাটে না।
  • মাছ ভাজা না ভাঙার কৌশল: মাছ ভাজার সময় কড়াইতে লেগে গেলে সাথে সাথে জোরাজুরি না করে গ্যাস বন্ধ করে পাত্র ঠান্ডা হতে দিন; ঠান্ডা হলে সহজে উল্টানো যাবে, নরম কাটা যুক্ত মাছ ও ভাঙবে না। এছাড়া তেলে আগে সামান্য নুন দিয়ে নিলেও মাছ আটকায় না।

পারিবারিক হেঁশেলের স্মৃতি: এই রান্নাগুলো আসলে শুধু রসনাতৃপ্তির পদ নয়; এ যেন আমাদের ঠাকুমা-দিদিমাদের আমল থেকে বয়ে আনা এক টুকরো পারিবারিক ঐতিহ্য। দাদু-ঠাকুমার পুরোনো দিনের হেঁশেলে কোনো কৃত্রিম নিয়মের আড়ম্বর ছিল না, ছিল ঋতু অনুযায়ী শরীর সুস্থ রাখার আদিম রসায়ন।

ঠিক যেমন তেঁতো শাকের এই পদটি, তেমনই বাংলার আরেকটি অপূর্ব হারিয়ে যাওয়া ভেষজ স্বাদ দেখতে পারেন—আমাদের পারিবারিক স্মৃতির উচ্ছে দিয়ে লেটা মাছের ঐতিহ্যবাহী দাদুর রান্না । পুরোনো দিনের এমন সহজ রান্নাই আজও বাঙালির আসল শেকড়কে ধরে রেখেছে।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১. 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা' রান্নায় ভেটকি মাছ ছাড়া অন্য কোনো মাছ ব্যবহার করা যায় কি?

হ্যাঁ, ট্র্যাডিশনাল এই রেসিপিতে ভেটকি মাছের মাথা ও কাঁটা সবচেয়ে ভালো মানালেও, আপনি চাইলে কাতলা, রুই বা যেকোনো বড় মাছের মাথা ও তেল দিয়েও এটি রান্না করতে পারেন।

২. এই রান্নাটিতে তেল এত কম ব্যবহার করার কারণ কী?

এটি বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের একটি সনাতনী রান্না, যেখানে অতিরিক্ত তেল-মশলার বদলে শাকসবজি ও মাছের নিজস্ব ফ্লেভার বা স্বাদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাছাড়া মাছের মাথা ও পেটির নিজস্ব প্রাকৃতিক তেলেই এই শাকের 'সরসরি' ভাজা বা সেদ্ধ ভাবটি চলে আসে।

৩. তেঁতো শাক বলতে এখানে কোন কোন শাক ব্যবহার করা হয়েছে?

ঐতিহ্যবাহী এই রেসিপিতে মূলত কুলেখারা, কচি মুলো শাক (মুলো সমেত) এবং স্বাদের ভারসাম্য আনতে এক মুঠো কচি পালং শাক ব্যবহার করা হয়েছে।

৪. রান্না করার সময় কেন সবসময় গরম জল ব্যবহার করতে বলা হয়?

গরম জল ব্যবহার করলে রান্নার তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায় না, ফলে শাকসবজি ও মাছের প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ এবং নিজস্ব স্বাদ বজায় থাকে। ঠাকুমা-দিদিমাদের আমল থেকেই রান্নায় ঠান্ডা জলের বদলে গরম জল দেওয়ার এই নিয়ম চলে আসছে।

৫. মিষ্টিতে এক চিমটে নুন বা পায়েসে নখের ডগায় নুন দিলে কী হয়?

এটি একটি পুরোনো ঘরোয়া কিচেন সিক্রেট! সামান্য একটু নুন দিলে মিষ্টির স্বাদ বা মিষ্টতা বহুগুণ খোলতাই হয় এবং মিষ্টির স্বাদটি মুখের ভেতর আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এখানে লবণের পরিমানে সব সময়েই নিজের বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে । নখের ডগায় মানে কতটা কম হলে ঠিক বা উপযুক্ত সেটা বোঝানো ।

© Food Cooking Inspiration | পারিবারিক ঐতিহ্যের স্বাদ

More in Traditional Bengali Recipes